September 26, 2021

Shimanterahban24

Online News Paper

“আলেমদের মাদরাসা-মসজিদ নিয়ে থাকলে হবে না” ছাত্রদের জীবনে একটি আত্মঘাতী কথা

1 min read
আব্দুল্লাহ সালমান

আব্দুল্লাহ সালমান

সাম্প্রতিক সময়ে তালিবুলইলমের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে মারাত্মক এক ব্যাধি। তাদের মনে পুঁতে দেওয়া হচ্ছে বিষাক্ত এক বীজ।
আমাদের সমাজে তথাকথিত আধুনিক কিছু আলেম তৈরি হয়েছেন।

কিছু প্রোগ্রাম এবং লাইভ ব্রডকাস্ট ছাড়াও যেভাবে সুযোগ পাচ্ছেন সেভাইবেই কওমী ছাত্রদের মাঝে একটি কথা ছড়িয়ে দিচ্ছেন যে,

“আলেমদের শুধু মাদরাসা-মসজিদ নিয়ে চিন্তা করলে হবে না। এসবের কারণে মানুষ আলেমদেরকে সমাজের বোঝা মনে করে।”

কথাটির প্রভাব ছাত্রদের মাঝে এমনভাবে বিস্তার লাভ করেছে যে, তারা এখন ইলমের তলবকে পাশ কাটিয়ে অতিরিক্ত বেশকিছু বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে।

তাদের মাইন্ডে সেটাপ হয়ে গেছে যে, আমি বড় হয়ে তো মাদরাসা-মসজিদে খেদমত করব না তাহলে আমার এত পড়ে লাভ কী?

কিতাবী মেহনত ত্যাগ করে ছাত্ররা কম্পিউটার নিয়ে ব্যস্ত। সোশাল ইন্টারনেট নিয়ে কাজ করছে। ওয়েব ডেভেলপমেন্ট নিয়ে ঘাটাঘাটি করতেও আগ্রহী।

এছাড়াও ফ্রিলান্সিংসহ নানাধরনের দক্ষতা অর্জনে ব্যস্ত। যার ফলে হাজারও প্রতিভা কলিতেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

তাদের আয়ু থেকে ছাত্রজীবন নামে ১৬/১৮টি বছর নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

এ সময়টাতে তাদের না হচ্ছে ইলম অর্জন আর না হচ্ছে দুনিয়া অর্জন।

অথচ আমাদের উচিৎ ছিল তাদেরকে ইমলের প্রতি আসক্ত করা। তাদেরকে ভিন্ন মাশগালা ছেড়ে কিতাবী মেহনতের তারগীব দেওয়া।

আগ্রহ প্রদান করা যে, তোমাদের একেকজনকে শায়খুল হিন্দের মতো হতে হবে।

শায়খুল আরবে ওয়াল আজম, শায়খুল ইসলাম হতে হবে। আহমদ শফী, বাবুনগরী, ক্বাসেমী, তাক্বী উসমানীর মতো হতে হবে।

তাদেরকে বুঝানো দরকার ছিল যে, আমাদের প্রথম টার্গেট হোক ইলমুল ওহী তলব করা।

একজন মানুষ যদি ইলমের ময়দানে উন্নতি সাধন করতে পারে তাহলে তার মাধ্যমে সব সেক্টরের মানুষের ফায়দা হবে। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ সঠিক পথ পাবে।

ইলম তলবের পরে চাইলে অন্য দিকে অগ্রসর হতে পারে। তাহলে তার পথহারা হওয়ার ভয়টা ৯৯% কমে যায়। তার দ্বারা কোনো অনৈতিক কাজ হবে না বলে আশা করা যায়।

তলবে ইলমুল ওহী থেকে ফারেগ হওয়ার পরে নিজের অবস্থান বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। যে পথে গেলে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া যাবে এবং উম্মাহর ফায়দা হবে সে পথ গ্রহণ করা যাবে।

ইলমী ইস্তেদাদ থাকলে দরস ও তাদরীসের নিয়োজিত হওয়ার দ্বারা দ্বীনের ফায়দা হবে বেশি। সেটা সময় সাপেক্ষ সিদ্ধান্তের ব্যাপার।

প্রথমেই যেন ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের প্রতিভার কবর রচনা করা না হয়। ইলমের লাইনে লেগে থাকলে হতে পারে একটা সময় দ্বীনের বড় দায়ীর কাজ আমার দ্বারা হবে।

এখন কেউ যদি বলেন, আমরা মেধার উপর ভিত্তি করে এরকম কথা বলছি যে, যাদের দ্বারা ইলমের লাইনে হবে না তারা অন্যদিকে অভিজ্ঞতা অর্জন করুক। তাহলে বলব, আল্লাহর বাণী لا تقنطوا من رحمة الله এর উপর আপনাদের আস্থা নেই।

বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলি, এমন অনেক ছাত্র দেখেছি, যারা বিশিষ্টজনের অনুপ্রেরণায় ছাত্র জীবনের প্রথম থেকে শেষের দিকে আশাতিত সফলতা অর্জন করেছে।

তাই সূচনাতেই অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার কোনো মানে হয় না। কারও মেধা কম হলে তাকে উৎসাহ দেওয়াই যুক্তিযুক্ত।

সুতরাং এসব কথা ব্যাপকভাবে না বলে শিক্ষা সমাপনকারী ভাইদের বললে তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারবে।

যারাই এসব বলে ছাত্রদের জীবনে চিড় ধরাচ্ছেন তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড তদন্ত করলে দেখা যায়, পড়ার সময়ে থার্ডক্লাস লেভেলের অবস্থানে ছিলেন।

আমি নিজেও এরকম মানুষের সংস্পর্শে নিজেকে ব্যাকফুটে ঠেলেছি অনেক। এ সময়ে এসে অনুধাবন করতে পারছি যে, জীবনের কতটা সময় ব্যয় করেছি মূলহীনভাবে।

আমি বলছি না, সবদিকে মানুষের দরকার নেই। বলছি আগে নিজেকে গঠন করতে তাকে সহযোগিতা করতে হবে। একটা সময় সে নিজেই অনুভব করতে পারবে তার দ্বারা কোন জায়গায় ফায়দা হবে।

দ্বীনী ইলমের প্রতি ছাত্রদের অনিহা তৈরি করা তাদের এবং জাতির ক্ষতি বৈ কিছু নয়।
আলেমরা কখনোই সমাজের বোঝা ছিল না, আগামিতেও হবে না। এরকম ভুল মেসেজ দিয়ে মানুষকে আলেমবিদ্বেষী করা দ্বীনের সাথে দুশমনীর নামান্তর।

রাব্বে কারীম বলেন,

اِنَّمَا يَخْشَى اللّٰهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمٰٓؤُا ؕ
নিশ্চয় আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে ওলামায়ে কেমরামই তাঁকে ভয় করেন।

রাসুলুল্লাহ সা. বলেন,
العلماء ورثة الأنبياء
ওলামায়ে কেরাম নবীগণের ওয়ারিস।
সমাজের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে আলেমদেরকে কুরআন-হাদীস স্বীকৃতি প্রদান করেছে।

কেউ যদি এটাকে অস্বীকার করে তাহলে আর যাই হোক তাকে মানুষ বলা আমাদের ভুল হবে।

কওমী মাদরাসা হচ্ছে দ্বীন রক্ষার দূর্গ, মসজিদ হচ্ছে দ্বীন ইসলামের কেন্দ্রবিন্দু।
আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত বলেন,
كنتم خير امة اخرجت للناس تأمرون بالمعروف وتنهون عن المنكر
তোমাদের মাঝে তারাই উত্তম উম্মত, যারা মানুষের উদ্দেশ্যে বের হয় আর ভালো কাজের আদেশ করে, মন্দ কাজ করা থেকে নিষেধ করে।

বর্তমান যুগে দুই ধরনের মানুষই এই দায়িত্ব আঞ্জাম দিচ্ছে। ওলামায়ে কেরাম এবং তাবলীগ জামাত।

কেউ মাদরাসার সাথে সম্পৃক্ত আর কেউ মসজিদের সাথে।

طلب العلم فريضة على كل مسلم
দ্বীনী ইলম শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্যে ফরজ।

রাসুল সা. এর এ হাদীস কমবেশি সবাই জানি। আর বর্তমান সময়ে এ ফরজ বিধান মাদরাসা-মসজিদ ছাড়া আদায় সম্ভব নয়।

অর্থাৎ এ ফরজিয়ত আদায়ের জন্যে মাদরাসা-মসজিদের বিকল্প নেই।

অন্য হাদীসে রাসুল সা. বলেন,
خيركم من تعلم القرآن وعلمه
তোমাদের মাঝে সবচে’ উত্তম ব্যক্তি সেই, যে নিজে কুরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়। এ কুরআন শিক্ষা করা এবং শিক্ষা দেওয়া হয় মাদরাসা-মসজিদেই।

এর মানে দাঁড়ায়, সমাজের উত্তম মানুষগুলোই মাদরাসা-মসজিদের সাথে লেগে থাকে, এবং এগুলো নিয়ে চিন্তা করে।

ইতিহাস খোঁজলে দেখা যায়, দ্বীন রক্ষার জিহাদে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন কওমী মাদরাসার ওলামায়ে কেরাম।

শাহ ওলী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী, মাহমুদ হাসান দেওবন্দী, হুসাইন আহমদ মাদানী, আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী, আল্লামা শাহ আহমদ শফি, আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী (রাহিমাহুমুল্লাহ) ছিলেন এই দ্বীনী দরসগাহের ধারক ও বাহক।

যারা তৈরি হয়েছিলেন মাদরাসা-মসজিদের মাধ্যমে এবং এর দ্বারা তৈরি করেছেন হাজারও ইসলামের সৈনিক।

তারা কখনও ছাত্রদের বলেন নি, মাদরাসা-মসজিদ নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। তারা সবসময়ই তা’লীম তারবিয়তে ছাত্রদের মাশগুল থাকতে বলেছেন।

তাই আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে ইলমের তলবে একনিষ্ঠতার সাথে লেগে থাকা।

আগে ইলম অর্জন করা পরে নিজের জীবনের জন্যে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। কথিত সুশীল দু’ চারজনের কথায় আমার উত্তম পথকে পদপৃষ্ঠে না মোড়ানো।

আল্লাহ আমাদেরকে দ্বীনের বড় বড় খাদেম হিসেবে কবুল করুন। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া তাওফিক দিন। আমীন।

লেখক : শিক্ষক, মারকাযুল হিদায়া সিলেট
সম্পাদক, সীমান্তের আহ্বান

 

Read more 

Copyright © All rights reserved. | Newsphere by AF themes.