• Tue. Aug 11th, 2020
Top Tags

হজরত শাহকামাল রাহঃ ও তদীয় পিতার কারামত

ByManaging Editor

Jul 1, 2020

[শাহ আতর আলী কামালী]

ইলমে তাসাউফ এক ভিন্ন জগত এটি স্বাভাবিক জগতের সাথে সব সময় সাঙ্গর্ষিক ।
২০১১ সালে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম মাসিক হেফাজতে ইসলাম ম্যাগাজিনে “ইসলামে সুফিবাদ ও ভ্রষ্টাচারের প্রেক্ষাপট” শিরোনামে ।
প্রসঙ্গ কারামত’ কারামত শব্দটি আরবি একবচন।
বহুবচনে ‘কারামাহ’। এর অর্থ বিশেষ ক্ষমতা, মর্যাদা ও সম্মান ইত্যাদি।
শরিয়তের দৃষ্টিতে কারামত হলো- মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁহার পছন্দের বান্দাদের থেকে এমন কিছু কাজ প্রকাশ করেন, যা দ্বারা তিনি তাদের সম্মানিত করেন, যা অস্বাভাবিক ও অলৌকিক।
নবী-রাসূলদের পরই এই বান্দাদের মর্যাদা, যাদের আউলিয়া হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন,
‎أَلا إِنَّ أَوْلِيَاء اللّهِ لاَ خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلاَ هُمْ يَحْزَنُونَ
নি:সন্দেহে, যারা আল্লাহর বন্ধু, তাদের না কোন ভয় ভীতি আছে, না তারা চিন্তান্বিত হবে।
সূরা ইউনুস আয়াত নং ৬২ আল্লাহ তায়ালার প্রিয় নবী গনের বৈশিষ্ট্যের সর্বোচ্চ নিদর্শন ‘মোজেজা ও কারামত ।
মোজেজা প্রকাশ পায় নবী ও রাসূলদের মাধ্যমে, আর কারামত হক্কানি আউলিয়ায়ে কেরামদের জন্য নির্ধারিত।
আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় বান্দাদেরকে তার অসংখ্য নিয়ামত অবলোকন করান।
কখনও সেগুলো সাধারণ মানুষের কাছে প্রকাশিত হয়, কখনও গোপন থাকে।
প্রিয় বান্দাগণের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা যেসব অলৌকিক ঘটনা বা অপ্রাকৃতিক বিষয় প্রকাশ করেন, সেগুলোকে কারামত বলা হয়।
কারামত কখনও বান্দার নিজস্ব ক্ষমতা বা ইচ্ছায় সংঘঠিত হয় না।
একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছা ও তাঁহার ক্ষমতায় বান্দার হাতে কারামত প্রকাশিত হয়।
এক্ষেত্রে বান্দা উপলক্ষ মাত্র।
মূল ক্ষমতা ও ইচ্ছা একমাত্র আল্লাহ তায়ালার।
কোন ব্যক্তি যদি প্রকৃত অর্থে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হয় এবং তার থেকে অস্বাভাবিক কোন কারামত প্রকাশিত হয়, তবে এটা অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে।

কাশফ কি? কাশফ বা এলহাম হতে অর্জিত জ্ঞান কতটুকু আমলযোগ্য?
কাশফ মূলত আরবী শব্দ।
যার অর্থ উম্মুক্ত হওয়া, বাতেনী রহস্যাদি সম্পর্কে অবগত হওয়া।
তরিকতের দৃষ্টিতে কাশফ হচ্ছে এক ধরনের অন্তর্দৃষ্টি, যার সাহায্যে প্রকৃত অলী আউলিয়া, গাউস ও সুফি সাধক বাতেনী জগতের দৃশ্য, অদৃশ্য বিষয়াদি এবং আল্লাহ্ তা’আলার জাত ও সিফাতকে জানতে প্রয়াস পান।
এবং ভবিষ্যত জগতের অনেক কিছু তাদের নিকট স্পষ্ট হয়ে যায়।
তবে কাশফ প্রকৃত আল্লাহর বন্ধুদের জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে খাস দয়া ও করুণা।
কোন কোন তরিকতপন্থী সূফির নিকট কাশফ লব্ধ জ্ঞানই প্রকৃত জ্ঞান।
প্রিয় পঠক এতক্ষন মুজিজা কারামত ও কাশফ বা এলহাম প্রসঙ্গে সংক্ষিত ভাবে লিখেছি এখন মুল কথায় ফিরে আশা যাক।

★ এখানে হযরত শাহকামাল রাহঃ ও তাঁহার পিতা হযরত বুরহান উদ্দীন কাত্তাল রাহঃ এর কারামত সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ ।
হজরত শাহ জালাল মুজররদ ইয়ামনী রাহঃ এর ৩৬০ জন ভ্রমন সঙ্গীর অন্যতম সাথী ও সুযোগ্য শিষ্য হযরত বুরহান উদ্দীন কাত্তালের মাজার সিলেটের পরিংজুড়া পরগনার হেমু মাজেরটুল পাহাড়ী ঠিলার উপরে অবস্থিত ।
এই হেমু এলাকায় আমি কয়েক বার ভ্রমন করেছি,
সেখানকার লোকের সাথে কুশল বিনিময় হয়েছে ।
তাহারা সবাই সর্ব সম্মত ভাবে বলেনন মাজেরঠুল পাড়ায় ( যে পাড়ায় মাজার অবস্থিত) লোক সারা বৎসর যা ভাল লাগে খেয়ে থাকে তাদের কারো ডাইরিয়া বা কলেরা রোগ হয়না ।
পাশের গ্রামে কলেরায় শতাদিক লোক মারা গেলেও মাজেরঠুল পাড়ায় একজন আক্রান্ত হয়নি ।
যুগ যুগ এভাবেই চলছে ।
সেখান কার স্থানীয় লোকেরা মনে করেন এটি হযরত বুরহান উদ্দীন কাত্তাল রাহঃ এর কারামত ।
পক্ষান্তরে হযরত বুরহান উদ্দীন কাত্তাল রাহঃ এর পুত্র হযরত শাহকামাল রাহঃ এর মাজার সুনামগঞ্জ জেলার শাহারপাড়া গ্রামে অবস্থিত ।
হযরত শাহকামাল রাহঃ এর কয়েকটি কারামত এখানে উপস্থাপন করছি ।

★ সাত দোয়ারী
এখানে নিচু উত্তর দক্ষিন লম্ভা সাতটি দরজা বিশিষ্ট সাতটি কামরা বা হুজরা খানা ছিলো।
এতে দুর দুরান্ত থেকে আগত মজ্জুফ ফকির দরবেশ টাইপের লোক কখনো স্থানীয় বাসিন্দা দুএক জন কে জিকির আজকার তসবিহ তাহলিল মোশাহেদা মুরকাবায় মশগুল কখনও ধ্যান মগ্ন থাকতে দেখা যায়,
উল্লেখ আবশ্যক ১৮৫৮ সালে বড় ভুমি কম্পে পশ্চিমের দুইটি কামরা ধ্বসে পড়লে স্থানীয় লোকেরা ৫টি কামরা রেখে পুনরায় মেরামত করেন।

★হযরত শাহকামাল রাহঃ এর আনীত দুটি উটপাখীর ডিম পাশের হুজরা ঘরে রক্ষিত ছিলো ডিম গুলি ভুমি কম্পে ভেঙে গুড়িয়ে শুধু খোলস পড়ে থাকে ।

★ হযরত শাহককামাল রাহঃ এর সঙ্গে আনা একটি মৃত্তিকা রঙের পাথর আজও বিদ্ধমান রয়েছে ।
পাথরটিকে প্রতিদিন সকালে দুধ পান করতে দেয়া হয়ে থাকে ।
পাথরটি নিয়মিত বাচ্ছা প্রসব করে এবং বড় বাচ্চাটি রাতের অন্ধকারে দরগাহের পুকুরে ডুবে অদৃশ্য হয়ে যায় ।
স্থানীয় লোকেরা ধারনা প্রসুত ভাবে কেহ বলেন পাথরটি দ্বারা হযরত শাহকামাল রাহঃ অবসরে বসতেন কেউ বলেন পাথর দ্বারা তাইয়াম্মুম করতেন আবার কেহ বলেন নিয়মিত ব্যায়াম করতেন এমনিতর পাথর নিয়ে না না মত রয়েছে ।

★ হযরত শাহকামাল রাহঃ এর দরগাহে তিনটি ডেগ বা হান্ডি রয়েছে এ গুলি এককেটিতে একটি ছোট গরু পাক করা যাবে ।
পুর্বেকার সময়ে গ্রামে বিভিন্ন অনুষ্টানে তা ব্যবহার করা হতো ।
বর্তমানে ডেকোরেটার্স সিস্টটেম চালু হওয়ায় ডেগ গুলি তেমন কাজে লাগেনা বললেই চলে তবে ডেগ তিনটি খাদিম গোত্রের দায়িত্বে দরগাহের জিম্মায় সংরক্ষিত আছে।

★ দরগাহের ডামাকা ( ধামাকা ) এটি একপ্রকার নাইন্দা বা ঘামলার মত সম্মুখ ভাগে গরুর চামড়া দিয়ে আবৃত্ত,
এটিতে আঘাত করলে প্রায় ঢোল তবলার মত বিকট শব্দ হয়। আগেকার যুগে মাইকের প্রচলন ছিলোনা তাই জরুরী বিত্তিতে ডমকায় আঘাত করে শব্দ ধ্বনী করা হত গ্রামের মানুুষকে জড় করার জন্য। বৎসরে দুই ঈদের জামাতে গ্রামবাসী শরীক হওয়ার জন্য উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে ডামাকা বাজানো হত। বর্তমানে ডামাকা খাদিম গোত্রের জিম্মায় সংরক্ষিত আছে।

★ দরগাহের কাঞ্জি এক প্রকার সুস্বাদু পানীয় ।
উহা বিশেষ প্রক্রিয়ায় খাদিম পরিবারের লোকেরা প্রস্তুত করে থাকেন ।
যতটুকু এ ব্যাপারে জেনেছি তা হলো মাটির একটি মটকায় একপ্রকার গাছের শিকড় পুকুরের পানি ও প্রতিদিন সকালে ভাত পাক করার পর আগ ভাত কয়েক চামছ মটকায় রাখা পানিতে ফেলে দেয়া হয়, বৎসরের পর বৎসর এক পদ্ধতিতে ভাত মটকায় দেয়া হয় কিন্ত ভাত পচে গলে এমন এক সুস্বাদু পানীয়তে রুপ নেয় যা গরমের দিনে হলে শুধু পান করার ইচ্ছা হয় ।
মটকার পানীতে দীর্ঘ দিন ভাত পচে গলে কোন ব্যাক্টেরিয়া জন্মায় না কিংবা কাঞ্জি পেট পুরে খেলেও ডায়রিয়া হয়না বরং আশে পাশের লোকেরা ভক্তিভরে রোগ মুক্তির জন্য পান করে থাকেন ।
খাদিম পরিবার থেকে কাঞ্জি পানির মুল্য স্বরুপ কোন টাকা পয়সা নেন না ।
পুকুরে বা নদীতে স্বর্ণালঙ্কার পড়ে গেলে বা হারিয়ে গেলে আপনি টাহর করতে পারছেন না কোন জায়গায় পড়েছে তখন যে পুকুরে বা নদীতে পড়েছে সে যায়গা ধারনা করে কাঞ্জি পানি ছিটিয়ে দিলে স্বর্নালঙ্কার যে যায়গায় আছে সে যায়গার পানি, ভাতের ফেনি উতরানোর মত ভটভট করতে থাকবে ।

★ সব চেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো শাহকামাল রাহঃ এর ছোট ছেলে মোয়াজ্জম উদ্দীন ওরফে রুকন উদ্দীনের অধঃস্থন বংশধর খাদিম গোত্র ।
উক্ত খাদিম গোত্রের বাচ্ছা থেকে বুড়ু পর্যন্ত কেউ হিদল শুটকি ( মটকায় পচানো মাছের শুটকি ) খেতে পারবেননা ।
আর যদি ভুল ক্রমে কেউ সামান্য খেয়ে পেলেন তাহলে তাৎক্ষনিক গলা ফুলে যাবে ব্যাথা অনুভব করবে তা তিন দিন পর বিনা চিকিৎসায় সেরে উঠবে ।
,
ধন্যবাদ সম্মানিত শাহারপাড়াবাসী ধন্যবাদ প্রিয় পাঠক ও ধন্যবাদ সুহৃদ বন্ধু মহলকে জীবন থাকলে আবার আপনাদের জন্য ভাল কিছু নিয়ে আসার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ ।

লেখক : সাহিত্যিক, কলামিষ্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *