Main Menu

নতুন বাজেট, সেই পুরনো বইয়ের নতুন মলাট; সংশোধনীয় আবশ্যক

সম্পাদকীয়

প্রতিবারের মত এবারও জাতীয় বাজেট ঘোষণা সরাসরি শুনতে পারিনি। দিন শেষে ইন্টারনেটে সেইভ করা ভিডিওগুলো দেখে শুনা আর পত্রিকার বোল্ড অক্ষরের লেখা “অর্থনৈতিক উত্তরণ ও ভবিষ্যৎ পথ পরিক্রমা” শিরোনামে সংবাদগুলো পড়ছিলাম। যা শুনে ও পড়ে মনে হচ্ছে নতুন বাজেট ২০২০-২০২১, সেই তো পুরনো বইয়ে নতুন মলাট লাগানো ছাড়া কিছু নয়।

প্রথম আলো সূত্রে জানা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। ১১জুন, বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ ভবনে বিশেষ বৈঠকে মন্ত্রিসভা নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দেয়।
এটি দেশের ৪৯তম, আওয়ামী লীগ সরকারের ২০তম এবং বর্তমান অর্থমন্ত্রীর দ্বিতীয় বাজেট। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে করোনাভাইরাস পরবর্তী অর্থনীতি মোকাবিলায় নানা ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এটি গতানুগতিক বাজেট নয়; এটিকে বলা হচ্ছে অর্থনৈতিক উত্তরণের বাজেট। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেট ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এবার বাজেটের আকার ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

একনজরে বাজেট ২০২০-২০২১

বাজেটের শিরোনাম “অর্থনৈতিক উত্তরণ ও ভবিষ্যৎ পথ পরিক্রমা”
মোট বাজেটঃ ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা।
ঘাটতি ১,৮৯,৯৯৭ কোটি টাকা।
মোট আয় ৩,৮২,০১৬ কোটি টাকা।
মোট রাজস্ব ৩,৭৮,০০৩ কোটি টাকা।
ADP ২,০৫,১৪৫ কোটি টাকা।
প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৮.২০%।
মুদ্রাস্ফীতি ৫.৪%।
গত বাজেট ২০১৯-২০ বাজেট ছিল ৫,২৩,১৯০ কোটি টাকা।
সরকার পরিচালনার ব্যয় ৩,৪৮,১৮০ কোটি।
গত বছর প্রবৃদ্ধি ছিল ৮.১৩%।
সাধারণ মানুষের কর আয় সীমা ৩ লাখ টাকা।

চলে গেলাম বাজেটের শেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ রাজস্ব খাতে। শুরু করি বাজেটের শেষ ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ থেকেই। বাজেটে কথা বলার ওপর বাড়তি শুল্ক বসানো হয়েছে। গত ৩০ জানুয়ারি প্রকাশিত এক পত্রিকা থেকে বিটিআরসি’র তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৬ কোটি ৫৫ লাখ ৭২ হাজার। তার মানে গড় হিসেবে প্রায় সবার হাতেই মোবাইল। এ কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সহজ উপায় হিসেবে খাতটি বেছে নিলেও তার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া কিন্তু ভয়াবহই হবে।

ভাবেন তো, দুঃসহ করোনার অসহনীয় দিনগুলোতে পারিবারিক বা সামাজিক দূরত্বে থেকে যদি কারও খবর নিতে চান তো বাড়তি টাকা গুনতে হবে। করোনা সংক্রান্ত কারণে নির্দিষ্ট ফোন নম্বরগুলোতে একনাগাড়ে ফোন করে সময়, শক্তি ও বিলের ভারে আপনি ক্লান্ত হলেও অপারেটর ফোন স্ক্রিনে কত টাকা বাড়তি দিতে হবে তা বলতে সময় নেবে সেকেন্ডেরও কম। অনলাইন অফিস, ক্লাস আরও কত কি! অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনার কারণে দেশে প্রায় দেড় কোটি মানুষ চাকরিহারা হবে। এছাড়া, ব্যবসা বাণিজ্যেও এর ভয়াল প্রভাব তো আছেই। এই সময় আপামর জনসাধারণের অতি প্রয়োজনীয় এই জায়গায় হাত দেওয়া কি ঠিক হয়েছে!

সামনের দিনগুলোতে আমাদের সবচেয়ে বড় নির্ভরতার জায়গা আইসিটি খাত। ‘অফিস ফ্রম হোম’ই হবে স্বাভাবিক নিয়ম। আইসিটি কেন্দ্রিক কাজকর্ম বা ব্যবসার চাহিদা দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে এবং যাবে। অনলাইনভিত্তিক কাজে ছেলেদের পাশাপাশি সেইফ হয়ে বাড়িতে বসে কাজ করার সুযোগ কাজে লাগাতে পারে আমাদের মেয়েরাও। তার মানে অবাধ ইন্টারনেট সুবিধা, কারিগরি দক্ষতা, কম্পিউটার বিষয়ক জ্ঞানের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয়ের সমন্বয় করাই ছিল মূল জায়গা। সারাদেশে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এখন অতি দরকারি। কিন্তু এ ধরণের নির্দেশনা কোথায়?

সবচেয়ে হতাশার দিকটি হল, এ বাজেট আমাদের একটি নৈতিক অবস্থানে নিয়ে আসতে পারেনি। আবারও কালো টাকা সাদা করার মতো একটি অনৈতিক প্রস্তাব রাখা হয়েছে। আপনি ১০ শতাংশ কর দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু খাতে বিনিয়োগ করলে আপনার আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে না। তার মানে হল আপনি ইয়াবা বিক্রি করে হোক আর ঘুষ-দুর্নীতি করে হোক, ১০ শতাংশ কর দিলেই সব হালাল হয়ে যাবে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত সুনাগরিকদের প্রতি অবিচার, সৎ নাগরিকদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ। দুর্বল চিত্তের কিছু মানুষ এর পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, তারপরও যদি টাকাটা বাজারে আসে তাহলে মঙ্গল হবে। আমরা মনে করি, সে আশা পূরণ হওয়ার নয়। ১৯৭৩ সালে এদেশে কালো টাকার পরিমাণ ছিল জিডিপির ৭ শতাংশের কম। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০১৯ সালে তার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় জিডিপির ৩৫ শতাংশ। গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে কালো টাকার পরিমাণ বর্তমানে ৭ লাখ কোটি টাকার কম নয়। অথচ এযাবৎকালে এত সুযোগের পরও কালো টাকা সাদা হয়েছে মাত্র ১৭ হাজার কোটি টাকা (২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেই সাদা হয়েছে ১১ হাজার কোটি টাকা)। তাহলে আপনি কোন ভরসায় আবার ওই অভিশপ্ত পথে হাঁটছেন?

মহামারি করোনা পরিস্থিতিতে দেশের স্বাস্থ্যখাতের যে করুণ দশা স্পষ্ট হয়েছে, এটা থেকে উত্তরণের জন্য বাস্তবসম্মত কোন ব্যবস্থা নতুন বাজেটে নেই। শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা এবং খাদ্য নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্যখাতের মতোই অবহেলার শিকার।

এদিকে কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি। কৃষকরা বরাবরই তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় না। প্রস্তাবিত বাজেটে উৎপাদনের উপকরণের মূল্য হ্রাসের কোন কথা বলা হয়নি। কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতসহ কৃষিখাতকে যথাযথ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়নি বাজেটে। অথচ কৃষিকে আরও উন্নত ও স্ট্যান্ডার্ড মানে নিয়ে যেতে দরকার প্রচুর দক্ষ জনবল ও গবেষণা। এটা নিয়ে ভাবা ও নির্দেশনার দরকার ছিল মনে হয়।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে শ্রমিকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। শ্রমিকদের স্বাস্থ্য, আবাসন ও জীবন যাপনের সঙ্কট নিরসন এবং অপেক্ষাকৃত সহজতর করতে বাজেটে বিশেষ কোন উল্লেখ নেই। তৈরি পোশাক খাত। এই খাত নিয়ে আমার তেমন বলার কিছু নেই। ৪০ বছর ধরে শিল্পটি অপরিকল্পিত থাকলেও নিজেদের সুবিধা নিতে তাদের কখনও ভুল হয় না। শ্রমিকের দোহাই দিয়ে বরাবর খাতটি সরকারকে চাপে ফেলে। অথচ এই সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। সেই স্বপ্নকে সামনে রেখে কিছু তরুণ নিরলস খেটে যাচ্ছে। গত ১২ বছরে দেশে অনেকগুলো স্টার্টআপও তৈরি হয়েছে। করোনার ধাক্কায় সেসব এখন নড়বড়ে অবস্থায়। অথচ ৪০ বছর পরেও দাঁড়াতে না পারা শিল্পকে ভর্তুকি না দিয়ে সরকারের কি অন্যদিকে মনোযোগ দেওয়ার সময় হয়নি?
করোনায় প্রথম প্রণোদনা পেয়েছে তৈরি পোশাক খাত। আজ বাজেটে দেখা গেল রফতানিতে নগদ প্রণোদনা ১ শতাংশ অব্যাহত রয়েছে। আবার সেই সাথে উৎসে কর কমানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু যে শ্রমিকের কথা বিবেচনা করে সরকার সবসময় মাথা নুইয়ে থাকে, সেই তাদের ছাঁটাই কি বন্ধ হয়েছে? ধারাবাহিক বেতন ভাতা পাওয়ার বিষয় নিশ্চিত হয়েছে?

বাজেটে ব্যাংক থেকে ৮৪ লাখ ৯ হাজার ৮০ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রস্তাবের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতকে আরো সংকটের দিকে ঠেলে দেয়া হবে। এতে করে দেশের আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা আরো ভঙ্গুর হয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা।

যেখানে কোটি কোটি মানুষের মৌলিক অধিকার ও ন্যূনতম বেঁচে থাকার সুযোগও সংকীর্ণ, সেখানে ঋণ করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এতো বেশি বেতন-ভাতা দেওয়ার কোনও মানে নাই।

এ বাজেট আমাদের একটি নৈতিক অবস্থানে নিয়ে আসতে পারেনি।  জনবিরোধী বাজেট প্রণেতাদের ইতিহাস কখনো ক্ষমা করবে না।
প্রস্তাবিত বাজেটের প্রায় ৩ ভাগের ১ ভাগই ঋণ নির্ভর। এভাবে চলতে থাকলে সরকারের পক্ষে ঘাটতি বাজেট থেকে বের হয়ে আসা কখনোই সম্ভব হবে না। এতে করে সরকারের ব্যাংক নির্ভরতা আরো বৃদ্ধি পাবে এবং জনগণের উপর জাতীয় ঋণের বোঝা ভয়াবহ রূপ নিবে। ফলে বাজেটে ঘাটতি ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি থেকে আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাক এই বাজেট সংশোধন করা অতিব জরুরী। দেশের স্বার্থে, দশের স্বার্থে, বৃহৎ স্বার্থে সংশোধনীয় আবশ্যক।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *