January 27, 2023

Shimanterahban24

Online News Paper


Warning: sprintf(): Too few arguments in /home/shimante/public_html/wp-content/themes/newsphere/lib/breadcrumb-trail/inc/breadcrumbs.php on line 254

রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা ভাষা: শুদ্ধতা রক্ষার্থে চাই কার্যকরী পদক্ষেপ

1 min read

[আবু জোবায়ের]

একুশে ফেব্রুয়ারি; জাতির জীবনে শোকাবহ, গৌরবোজ্জ্বল, অহংকারে মহিমান্বিত চিরভাস্বর একটি দিন। সেদিন মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল রফিক, জব্বার, সালাম, বরকত ও সফিউররা। পৃথিবীর ইতিহাসে এর কোনো নজির নেই। তাই ১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা লাভ করে। এবং তখন থেকেই এটি সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। যা বাংলা ভাষার বিশ্বজয়।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল ঔপনিবেশিক প্রভুত্ব ও শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম প্রতিরোধ এবং জাতীয় চেতনার প্রথম উন্মেষ। এর মাধ্যমেই বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। তাই দিনটি জাতীয় জীবনে চির প্রেরণার এবং অবিস্মরণীয় হয়ে আছে।

বাংলা ভাষায় বালিয়াডি:

রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলার ব্যাপারে কোনো ঔদাসীন্য দেখানো যাবে না। তাকে যথাযোগ্য ব্যবহার ও চর্চা করতে হবে। কেননা এগুলোর ওপর বাংলার সমৃদ্ধি অনেকাংশে নির্ভরশীল। সমৃদ্ধি না ঘটলে ভাষা দীন হতে থাকে এবং একসময় বিলুপ্ত হয়ে যায়।

বাংলা ভাষা দিন দিন নিষ্প্রাণ ও নিষ্প্রভ হয়ে যাচ্ছে— রূপান্তর, অপব্যবহার, বিকৃতিসাধন ও ভাষার ব্যবহারে অসচেতনতা; ইত্যাদি নানাবিধ কারণে। এছাড়া বিশ্বায়ন, আকাশ সংস্কৃতি, ডিজিটাইজেশনের কারণেও বাংলা নিজস্ব প্রবহমানতা ও স্বকীয়তা হারাচ্ছে। তার ওপর আছে আবার বিদেশি ভাষার আগ্রাসন।

বাংলা ভাষার দূষণ:

বাংলাদেশের সব ধরনের গণমাধ্যমেই বেশ কয়েক বছর ধরে বলা হচ্ছে, বাংলা ভাষা বাংলাদেশের নদীগুলোর মতোই দূষিত হয়ে উঠেছে। এই দূষণ হচ্ছে প্রধানত তিনটি ক্ষেত্রে— ১. ইংরেজি বা আঞ্চলিক ঢঙে প্রমিত বাংলা উচ্চারণে, ২. কথা বলার সময় বাংলা শব্দের পরিবর্তে ইংরেজি-হিন্দি-উর্দু-আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহারে এবং ৩. বানান বিকৃতিতে। অভিযোগের আঙুল উঠেছে এফএম রেডিওসহ বিভিন্ন বেসরকারি গণমাধ্যমের দিকে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলা ভাষার সঙ্গে ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু ও ফারসির মিশ্রণ চলছে। আধুনিকতার দোহাই দিয়ে এ রকম নানা শব্দ ঢুকে বাংলা ভাষাকে দূষিত করছে, বিকৃত করছে। এবং বিভিন্ন মাধ্যমে বিকৃতির প্রভাব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ছে সবখানে। জনে-জনে। মুখে-মুখে।

বাংলা ভাষার জগাখিচুড়ী:

আজকাল বেতার-টিভি চালু করলেই শোনা যায়-‘হ্যালো লিসেনার্স’, ‘হ্যালো ভিউয়ার্স’, ‘সংগস প্লে’–সহ বাংলা ভাষার সঙ্গে বিকৃত উচ্চারণে অনেক ইংরেজি শব্দ।
আবার নাটকের নাম— ‘ডেট ফেল’, ‘লাভ ডটকম’, ‘হাউসফুল’, ‘বাংলা টিচার’, ‘হিরো আকরাম’ ‘ফুল ম্যাড’; ইত্যাদি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এভাবেই গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন, নাটক বা চলচ্চিত্রে ‘জগাখিচুড়ি’ ভাষার ব্যবহার মূল ভাষায় প্রভাব ফেলছে। আবার বেতারের ‘জকি’ চরিত্রটি ভাষার বিকৃতিতে নজির দেখাচ্ছে। এদের দ্বারা
তথাকথিত আধুনিকতার নামে তরুণরা প্রভাবিত হচ্ছে এবং ভাষার পরিচয়, ভাষার রূপ বদলে ফেলছে।

বর্তমানে স্যোশাল মিডিয়ায় f9, r8, tc, wc, 2me, tnx, এ ধরনের সংক্ষিপ্ত শব্দ বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে । এবং নতুন প্রজন্মের মাঝে এ সব কোড বা সংক্ষিপ্ত ভাষা খুবই জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। যদি কেউ এ সব ভাষা না বুঝে তাহলে সে অন্যদের কাছে হয় ক্ষ্যাত বা ‘আতেঁল’। অথচ এ সব শব্দ সম্পর্কে যদি কারো পূর্ব ধারণা না থাকে, তাহলে তাঁর পক্ষে কিছুই বোঝা সম্ভব না।

এফএম/ভাই-ব্রাদার ল্যাঙ্গুয়েজ:

ভাষার সংক্ষিপ্তকরণের সাথে তাল মিলিয়ে উচ্চারণের বিকৃতি এবং বিদেশি শব্দের মিশ্রণও ঘটছে দ্রুতই। যেমনটি ফুটে উঠেছে দুই বন্ধুর কথোপকথনে:

– ‘‘আরে মাম্মা কোত্তে আইলি। তোরে তো সারসাইতে সারসাইতে (সার্চ-খোঁজা) আমার অবস্থা খারাপ। ফোনটাও অফ করে রাখছোস। পরে তোর জিএফরে ফোন দিলাম। ও তো কইলো তুই ওর সাথেও নাই। কই আছিলি ক’তো?’’

– ‘‘আর কইস না মামা, এই জিএফটাকে নিয়ে ব্যাপক প্যানার মইধ্যে আছি। এমতে ক্লাস, এক্সাম নিয়ে আছি দৌরের উপ্রে; তার ওপর আবার জিএফের প্যানা। মাঝে মইদ্যে মুঞ্চায় ব্রেকআপ কইরা ফালাই।’

এছাড়াও তরুণদের মুখে মুখে ‘আবার জিগায়’, ‘খাইলেই দিলখোশ’, ‘এক্সট্রা খাতির’, ‘তোর বেইল নাই’ ইত্যাদি নানান শব্দের ব্যবহার। তরুণদের কাছে এটা কথা বলার নতুন একটি স্টাইল। যাকে তাঁরা এফএম ল্যাঙ্গুয়েজ অথবা ভাই-ব্রাদার ল্যাঙ্গুয়েজ বলে থাকে।

ভাষাবিদদের প্রতিক্রিয়া:

বাংলা ভাষার বিকৃতি ও ব্যবহার সম্পর্কে ভাষাবিদ অধ্যাপক ড. হায়াত মামুদ গনমাধ্যমকে বলেন, ‘নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষার যে নোংরা চর্চা চলছে তাতে প্রকৃত মৌলিক বাংলা ভাষার অস্তিত্ব ভবিষ্যতে থাকবে কিনা সেটায় এখন প্রশ্ন।’

তিনি আরো বলেন, ‘এ ছাড়া একটা বিশেষ গোষ্ঠী আমাদের নাটক ও সিনেমাতে প্রমিত বাংলার বদলে এ সব ভাষাকে স্থাপনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এবং প্রমিত বাংলা ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান না থাকা তরুণ প্রজন্মকে তাদের সৃষ্ট এ সব জগাখিচুড়ী ভাষায় কথা বলতে ও চর্চা করতে উদ্বুদ্ধ করছে। অভ্যস্ত করছে। যাতে ভবিষ্যতে প্রমিত বাংলাটি নতুন প্রজন্মের কাছে কৃত্রিম বলে মনে হয়।’

বাংলা ভাষার শুদ্ধতা রক্ষার্থে হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে, আমাদের মাতৃভাষা রক্ষার জন্য আদালত থেকে রুল দিতে হয়। একটি দেশের ভাষার প্রচার ও প্রসার ঘটে শিল্প, সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে। কিন্তু শিল্প চর্চার নামেই তো অশুদ্ধ ভাষার চর্চা চলছে।’

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ:

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিনে দিনে ভাষার দূষণ বেড়েই চলেছে। ভারতীয় হিন্দি চ্যানেলের ছড়াছড়ি বাংলা ভাষার ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। প্রচার মাধ্যমে বাংলা ভাষার বিকৃতি রোধে একটি তদারকি সংস্থা গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন তারা। তারা মনে করেন, ভাষার এই দূষণরোধে ব্যক্তি হিসেবে প্রত্যেকেরই আগে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি ভাষার অবক্ষয় রোধে গঠিত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী অবিলম্বে কীভাবে বাংলা ভাষার অবক্ষয় রোধ করা যায়, সে উদ্যোগ নিতে হবে।

একুশের চেতনা ও বাংলা ভাষার দাবি:

বাংলাকে শুধু একুশের আনুষ্ঠানিকতার ফ্রেমে না বেঁধে, লালন ও চর্চা করতে হবে সব সময়ের জন্য। তাই শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; ভাষাকে উপলব্ধি করতে হবে। তার শুদ্ধ ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

আর এ কাজে তরুণদেরই এগিয়ে আসতে হবে। কেননা তারুণ্য কখনো হারতে শেখেনি। এ জন্যই হয়তোবা কবি আসাদ চৌধুরী শহীদ মিনার কবিতায় বলেছেন—
শহীদ মিনার মানি অসমাপ্ত
বারবার ভাঙচুরের শিকার
আমাদের কীর্তি ও সাফল্যের
প্রথম সোপান তবু
তারুণ্যের স্বপ্নমাখা
শহীদ মিনার।

ভাষা শহীদদের জন্য করণীয়:

মুসলমানরা মৃত্যু পরবর্তী জীবন এবং সেখানের সুখ শাস্তিকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। পবিত্র হাদিসের ভাষ্যমতে, মানুষ যখন মারা যায় তখন তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়। সে পানিতে হাবুডুবু খেতে থাকা ব্যক্তির মতো বিপদসঙ্কুল অবস্থায় জীবিতদের থেকে সওয়াব প্রাপ্তির অপেক্ষায় থাকে। জীবিতরা যদি তার জন্য দোয়া, ক্ষমা প্রার্থনা ও দান-সদকা করে- তবে তাঁর বিদেহী আত্মার উপকার হয়।

ইসলামী বিধান অনুসারে শহীদদের জন্য আমরা নিম্নোক্ত কাজগুলো করতে পারি—
১) তাঁদের জন্য দু’আ করা।
২) তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা।
৩) তাঁদের নামে দান-সদকা করা।
৪) তাঁদের আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ খবর নেওয়া।
৫) তাদের স্মরণে মসজিদ, মাদরাসা, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, বৃহৎ সেতু ও ওভার ব্রিজসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী স্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা।

ইসলামের দৃষ্টিতে এগুলো ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা মৃত ব্যক্তির আত্মার উপকার হয় না। তাই এমন কোনো কাজ না করা, যা দ্বারা তাদের পরকালীন জীবনের জন্য কোনো উপকার হবে না এবং উল্টো গোনাহের কারণ হবে।

লেখক: আবু জোবায়ের (abujobaer928@gmail.com)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Copyright © All rights reserved. | Newsphere by AF themes.