Main Menu

চায়ের রাজ্য শ্রীমঙ্গলে একদিন; যা ছিলো ভ্রমণে

আবু তালহা তোফায়েল :: গত ১৯ ফেব্রুয়ারী দেশের চায়ের রাজ্য খ্যাত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের সৌন্দর্য ঘুরে দেখার তীব্র ইচ্ছা পূরণের সুযোগ হয়।
সুযোগ হলো এক বিস্ময়কর কাহিনীর কথা না বললেই নয়; আগেরদিন ১৮ ফেব্রুয়ারী প্রাণপ্রিয় বিদ্যাপীঠ জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গার দরসগাহে বসা; হঠাৎ বন্ধুবর শায়খুল ইসলাম ডাক দিয়ে ইনভাইট করলেন কালকে ভ্রমণ পাগলার চক্কর হবে, রেডি থেকো কিন্তু।
সারারাত ঘুছিয়ে নিলাম কাল যাবো ঘুরতে, শুধু আমি নয়- আমরা ৭ জন ছিলাম। (শায়খুল ইসলাম, আহমেদ উসমান, মাসুম আহমেদ, ইমাদ রায়হান, মাহফুজ আহমেদ, আল-আমিন ইসলাম এবং আমি)
ভোর ৫.৫৫ মিনিটে ঘুম থেকে উঠে ৬.০৫ এ বেরিয়ে পড়লাম। ৭ কিলোঃমিঃ হেটে সাথীদের আড্ডায় এড হলাম। তারপর সোজা সিলেট রেলস্টেশনে। দুর্ভাগ্যবশত সকালের ট্রেন মিস করে অপেক্ষা করতে হয়েছে সাড়ে ১০ টার ট্রেনের। যেহেতু অপেক্ষার চেয়ে বিরক্তিকর আর কিছু নেই, তাই সেলফিব্রীজসহ বিভিন্ন যায়গায় হাটাহাটি ঘুরাঘুরি করে খুব সহজেই ১০টা বেজে গেলো। আমরা ৭ জন ট্রেইনের টিকিট কিনে শ্রীমঙ্গলে যাওয়া আমরা মেনে নিতে পারছিনা। টিকিটবিহীন রেল যাত্রা। আসলেই খুব ভালো লাগলো মুহুর্তটা। রেলের সব ডাব্বাতেই যেনো আমাদের রাজত্ব। সিলেট থেকে মোগলাবাজার-মাইঝগাঁও-বরমচাল-কুলাউড়া পর্যন্ত খুব আরাম আয়েশেই পৌঁছলে টিটির টিকিট চ্যাকে বাঁচতে ফন্দি করতে হলো, নানান কৌশল অবলম্বন করতে হলো। তারপর শমশেরনগর রেলস্টেশনে পৌঁছে নতুন ফন্দী তৈরী করলেও কাজে আসেনি, ভানুগাছ রেলস্টেশনে পৌঁছে রেল থেকে নেমে যাই, আবার একেবারে সামনের ডাব্বায় উঠি, উঠেই রেল ছাড়ার ৩-৪ মিনিট পরেই সামনাসামনি টিটির সাক্ষাৎ। যাইহোক অল্প টাকাতেই টিটিকে ক্যাচ করতে সক্ষম হই; এব্যাপারে শায়খুল ইসলাম ভাইয়ের থিউরিটা ছিলো দারুণ মজার।
এভাবেই রেলের আসনে বসে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকন করে করে যেনো প্রকৃতির মায়ায় পড়ে গেছি। কখনো রেলের পাশে বাঁধা কুড়ে ঘরের টিনের ছালে সূর্যের আলোয় ছিলকি মেরে চোখে ধরে, এটা কিন্তু অসাধারণ ১টি দৃশ্য। আবার কখনো দালানকোঠা, আনারস বাগান, চা-বাগান, দুই পাহাড়ের মধ্যদিয়ে রেল লাইন আবার রেল লাইনের আঁকাবাঁকা রাস্তায় লম্বা রেল আঁকাবাঁকা হয়ে চলা এ যেনো এক মধুমাখা দৃশ্য। চোখটা পড়ে রয় এই দৃশ্যের নানান লীলাখেলায়। অবলোকন করি নিরবে, নিস্তব্ধে।

শ্রীমঙ্গল সুন্দরবনে

সুন্দরবনে যা ছিলো।

ফাল্গুনে শিমুলের লাল ফুল।

যাইহোক শ্রীমঙ্গলে পৌঁছেই নাস্তা করতে বসি। ও হ্যাঁ, সেখানে অনেক রসালো লেবু পাওয়া যায়। লেবু দিয়ে নাস্তা শেষে শুরুতেই চলে যাই সুন্দরবনে (বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন-এ)। সেখানে ফাল্গুনী হাওয়ার সত্য সত্য অবকাশ পাই। শিমুল গাছের লালফুল; দারুণ দৃশ্যনীয় বটে। বিভিন্ন জাতি প্রজাতির বন্যপ্রাণী দেখতে দেখতে অনেক সময় কেটে যায়।

বধ্যভূমি কিংব্রীজ।

বধ্যভূমিতে দুটি হৃদয়বিদারক প্রবাদ।

বধ্যভূমি মঞ্চ।

তারপর শ্রীমঙ্গলের বধ্যভূমি ৭১-এ পৌছিঁ৷ সত্যি সেখানে ৭১ এর অনেক স্মৃতি বেষ্টনীতে ঘেরাও যায়গাটি। দুটি লাল বৃত্তে লেখা দুপাশে দুটি বাক্য। (১/ পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্ত লাল,রক্ত লাল,রক্ত লাল। ২/ রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি বাংলাদেশের নাম) এই দুই প্রবাদ পড়ে খুব সহজেই দেশপ্রেমে আল্পুত হয়ে দুর্বল হয়ে যাই। অবশ্যই দেশপ্রেম সর্বদা হৃদয়ে গাঁথা আছে, তবুও অতিরিক্ত ইমোশনাল হয়ে যাই৷ সেখানে স্টিলের সুইমিংপুলসহ বেশকিছু দর্শনার্থীদের হৃদয় জুড়া যায়গা আছে।

চা-বাগানের মধ্যদিয়ে আঁকাবাঁকা ও উঁচুনিচু রাস্তা।

তারপর চলে যাই এমন এক যায়গায়, যা এই শ্রীমঙ্গলের ঐতিহ্য ফুটে তোলছে, তার নাম পর্যন্ত পড়ে গেছে অর্থাৎ চায়ের রাজ্যের শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানে। এতো সুবিশাল চা-বাগান; দৃষ্টি যতদূর পড়ে, শেষঅবদি চা-বাগানই দেখা যায়। দুপাশে চা-বাগান আর মধ্যদিয়ে আঁকাবাঁকা উঁচুনিচু রাস্তা। কি যে এক মায়াবী দৃশ্য, যেনো চোখটা এখানো সেই মায়াবতী মায়াবী স্পটে পড়ে আছে। আহ- কি যে খোদার অপরুপ কুদরতি নিপুণ হাতে সাজানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা অঞ্চল। শুধু চোখ নয়, হৃদয়টাও পড়ে আছে এখনো, বারবার যেতে ইচ্ছে করছে।

জান্নাতুল ফেরদৌসের আঙিনায়।

জান্নাতুল ফেরদৌসের প্রধান ফটক।

অতঃপর চলে গেলাম জান্নাতুল ফেরদৌসে।
ও হ্যাঁ, এটি একটি মসজিদ। একজন সুহৃদয়বান ব্যক্তির নিজস্ব অর্থায়নে বিরাট যায়গায় গড়ে তোলছেন এই অপরুপ সৌন্দর্য মণ্ডিত মসজিদটি। এখানে প্রতিনিয়ত শতশত দেশ-বিদেশের পর্যটকদের সমাগম ঘটে। নানান সৌন্দর্যের বস্তু দিয়ে সাজিয়ে তুলেছেন মসজিদটি। শুরুতেই দরগাহ হযরত শাহজালাল রহঃ এর প্রধান ফটকের মত সেখানেও দৃষ্টিনন্দন ফটক। তারপর বিশাল দৃষ্টিনন্দন প্রসস্থ রাস্তা, একপাশে সাদা ভবন, ফুলের গাছ, ছোট্ট হাফ ওয়াল অপরপাশে, তারপর আরেকটু সামনে আরেকটি সুন্দর ভবন, সুন্দর অজুখানা, এর পূর্বে উপরে প্লেইন রাস্তা দিয়ে পাহাড়ের উপরে; সবমিলিয়ে অসাধারণ ১টা যায়গা। এখনো মসজিদে যাওয়া হয়নি কিন্তু। তারপর দৃষ্টিনন্দন সিঁড়ি দিয়ে অনেক উপরে চলে সেই কাঙ্ক্ষীত জান্নাতুল ফেরদৌস মসজিদ। সেখানে আছে ফুলের বাগান, দু’পাশে ফুলের টবে রাখা অসাধারণ ফুলগাছ আর মসজিদের অবকাঠামো নির্মাণ নাই বল্লাম। সেখানে আছরের নামাজ আদায় করি এবং কিছু সময় ঘুরাঘুরি করে চলে যাই বিশ্বের অন্যতম রিসোর্ট গ্রান্ড সুলতানে।

গ্রান্ট সুলতানের প্রধান ফটকে।

গ্রান্ট সুলতানের ভিতরাংশ। এই ছবিটি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।

গ্রান্ড সুলতানে একদিন যাপন করতে হলে ১৪ হাজার টাকা লাগে, এই তথ্যটি সেখানকার বাসীন্দা দিয়েছেন। তার প্রধান ফটকে পৌঁছলেই সহজে বুঝতে পারবেন কত মনোমুগ্ধকর দৃশ্যটা। সুইমিংপুল, ছোট্ট ওভারব্রীজ, ফুলের তোড়া আর গাছের মোহড়া সেখানে। এদিক ওদিক থাকালেই মনে হয় এখানে ওখানে সব যায়গাই স্মৃতিচারণ করি। পুরো রিসোর্টটাই মনোমুগ্ধকর, এককথায় অসাধারণ।

ট্রেনের ভিতরের মুহুর্ত।

তারপর চলে আসি রেলস্টেশনে, নাস্তা শেষ করে ট্রেনের অপেক্ষায়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, সূর্যটা ডুবে যাচ্ছে, অন্ধকারাচ্ছন্যের প্রভাব পড়ছে৷ ট্রেন আসলো। আবারও টিকিটবিহীন যাত্রী। ভানুগাছ আসার পূর্বেই টিটি ভাইয়ের সাক্ষাৎ; যাকগে আবার শায়খুল ইসলাম ভাই অল্প টাকায় একি থিউরিতে হ্যান্ডেল করলেন।
তারপর জমলো বড় আড্ডা, আহমেদ উসমান ভাই কিন্তু খুব ভালো গান। ট্রেইনের এক ডাব্বায় আমরা ৭ জন বসে শুরু করে দিলাম ইসলামী গান গাওয়া।
আহমেদ উসমান ভাইর সাথে আমরাও সুর তোললাম। সাথে আলামিন ইসলাম ভাই তিনি সময়ে সময়ে ব্লগের জন্য শর্ট নেন মাঝেমধ্যে, দারুণ মানায়। আর মাহফুজ আলমের তেজস্বী রাগে আর গলার স্বরে সবাই রীতিমতো ধমকে যান, কেউ উল্টো পাল্টা করলে সহজে উনার সামনে পড়তে রাজি নয় কেউই। এমাদ রায়হান ভাই ছিলেন সকল সমস্যার সমাধান; সমস্যায় জর্জরিত হলে বিচারকের অনন্য ভূমিকায় ছিলেন তিনি। মাসুম আহমেদ ভাই ছিলেন ইনোসেন্ট বয়, ছবি তোলার জন্য ১টু তাড়াহুড়ো করতেন বটে, তবুও যথেষ্ট ভদ্রপোলা।
যাইহোক গানের সুরে সুরে মুগ্ধ শুধু মোরা নয়, ট্রেনের যাত্রী প্রায় সবাই৷ কেউবা উঁকি দিয়ে দেখে আমাদের আনন্দটা; সবার সাথে সেই আনন্দকে শেয়ার করতে সিলেট রেলস্টেশনে রাত সাড়ে ৮টায় পৌঁছে ফেবু লাইভে এসে সবাইকে মুগ্ধ করতে সক্ষম হয়েছি আহমেদ উসমান ভাইসহ উপস্থিত আমরা সবাই।

ভ্রমণের উদ্দেশ্য:- ভ্রমণের নিছক এই উদ্দেশ্যই ছিলো যে, খোদার অপরুপ সৌন্দর্য অবলোকন করে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং প্রত্যেক যায়গার মানুষেরা কিভাবে আছে, তা থেকে শিক্ষা নেওয়া।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *